লিখেছেন আতাউর রহমান –
“এ কী করলেন ছোট সাহেব!”???
সিলেটের সাম্প্রতিক এই ছবিকে ঘিরে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে—তার পেছনে কেবল একটি ছবি নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক বাস্তবতা, মানুষের জমে থাকা বেদনা ও বিশ্বাসভঙ্গের ইতিহাস কাজ করছে।
এই ক্ষোভ শুধু কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়; বরং সেই প্রতীকী অবস্থানের বিরুদ্ধে, যেখানে জনগণের প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে কেউ স্বৈরাচারের পাশে দাঁড়িয়েছে বলে মানুষ বিশ্বাস করে। এই ছবিতে যদি জনাব হুসাম উদ্দীন চৌধুরীর জায়গায় ছাহেবজাদায়ে বরুনা, আল্লামা গহরপুরী, কাতিয়ার সাহেবজাদা, কিংবা আল্লামা সাঈদী (রহ.)-এর পরিবারের কেউ থাকতেন, তবুও একই প্রতিক্রিয়া হতো। কারণ প্রশ্ন ব্যক্তি নয়—প্রশ্ন ছিল অবস্থানের।
২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর দেশের মানুষ ২০২৪ সালে আরেকটি একতরফা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিল। বিএনপি, জামায়াত, চরমোনাই, খেলাফত মজলিসসহ অধিকাংশ বিরোধী ও ইসলামী দল যখন নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন শেখ হাসিনা তার ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে কিছু ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাবশালী মুখ খুঁজছিলেন। সেই সময় সিলেট অঞ্চলে মরহুম ফুলতলী (রহ.) পরিবারের যে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রভাব ছিল, সেটিকে রাজনৈতিক বৈধতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—এমন ধারণা মানুষের মধ্যে গভীরভাবে জন্ম নিয়েছে।
মানুষের অভিযোগ—একটি সংসদীয় আসনের বিনিময়ে স্বৈরাচার, গুম, খুন, আয়নাঘর, দুর্নীতি ও দমননীতিকে পরোক্ষ বৈধতা দেওয়া হয়েছে। শাপলা চত্বরের শহীদদের রক্ত, নির্যাতিত আলেমদের কান্না, কারাবন্দী বিরোধী নেতাকর্মীদের আহাজারি—সবকিছুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। আর এখানেই ক্ষোভের মূল বিস্ফোরণ।
স্মরণ রাখতে হবে, মানুষের আবেগ কেবল রাজনীতির নয়; এটি বিশ্বাস, আস্থা ও ভক্তিরও প্রশ্ন। যেদিন শেখ হাসিনার সঙ্গে রাজনৈতিক সখ্যের ছবি প্রকাশ্যে আসে, সেদিন বহু মুরিদ ও অনুসারী প্রকাশ্যে কেঁদেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, তাদের আধ্যাত্মিক পরিবারের অবস্থান জনগণের অনুভূতির বিপরীতে চলে গেছে।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে আর কোনো নাম, বংশ বা ঐতিহ্য কাউকে জনরোষ থেকে রক্ষা করতে পারেনি। শেখ মুজিবের নাম যেমন হাসিনাকে রক্ষা করতে পারেনি, তেমনি কোনো পীর পরিবার বা রাজনৈতিক ঐতিহ্যও জনবিচারের ঊর্ধ্বে নয়।
সোবহানীঘাটে বিক্ষুব্ধ জনতার ঢল যখন বানের পানির মতো এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন কিছু মানুষ মানবঢাল হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। আজ তাদেরকেই “দাজ্জাল” আখ্যা দেওয়া নতুন করে মানুষের ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে। এর ওপর ১২ ফেব্রুয়ারির পর আবার নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য নিয়ে নির্যাতিতদের পক্ষে দাঁড়ানোর ভান—অনেকের কাছে তা আত্মসমালোচনা নয়, বরং নতুন মুখোশ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
সিলেটের মানুষ চায়—যে যার আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করুক, দল করুক, মতপ্রকাশ করুক। কিন্তু ধর্মের মঞ্চকে বিভাজন, ফতোয়াবাজি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র বানানো বন্ধ হোক। “অমুক কাফির, তমুক দাজ্জাল”—এই সংস্কৃতি সমাজকে শুধু বিভক্তই করেছে।
সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি এখন আত্মসমালোচনা, প্রজ্ঞা ও জনআবেগের প্রতি সম্মান। আশা করা যায়, বাস্তবতার কঠিন অভিঘাত একদিন হলেও বোধোদয়ের দরজা খুলে দেবে।
#সিলেট
#বাংলাদেশ_রাজনীতি
#জনরোষ
#স্বৈরাচার
#নির্বাচন_২০২৪
#শাপলা_চত্বর
#গণআকাঙ্ক্ষা
#ইসলামী_রাজনীতি
#সামাজিক_ক্ষোভ
#ফতোয়াবাজি_বন্ধ_হোক
#সত্যের_পক্ষে
#জনতার_রায়
#ফুলতলি



